অভিশপ্ত বুনন
নগরায়নের আগ্রাসনে বাংলার অনেক প্রাচীন জনপদই আজ তাদের নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়েছে। তবে সিরাজগঞ্জ জেলার একেবারে ভেতরের দিকের গ্রাম ‘ভবানীপুর’ যেন সময়ের কোনো এক অদৃশ্য খাঁচায় আজীবন বন্দি হয়ে আছে। একসময় এই গ্রামের তাঁতিদের বোনা শাড়ির সুখ্যাতি সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু মেশিনের যুগে হাতে বোনা তাঁতের কদর কমে যাওয়ায় গ্রামটি এখন প্রায় জনশূন্য। জরাজীর্ণ মাটির ঘর আর পরিত্যক্ত টিনের চালের নিচে উইপোকায় খাওয়া পুরোনো কাঠের তাঁতগুলো যেন অতীতের কঙ্কাল হয়ে পড়ে আছে।
রতন এই গ্রামে এসেছে প্রায় দুই যুগ পর। তার দাদা, কাদের মিয়া, এই গ্রামেরই শেষ দিককার একজন নামকরা তাঁতি ছিলেন। গত মাসে তিনি মারা যাওয়ার পর, শহরের স্থায়ী বাসিন্দা রতন বাধ্য হয়েই পৈতৃক ভিটা বিক্রি করার উদ্দেশ্যে ভবানীপুরে পা রেখেছে।
চৈত্র মাসের শেষ দিক। বাতাসে আগুনের হলকা, আর চারপাশের পরিবেশটা এক অদ্ভুত, গুমোট নিস্তব্ধতায় মোড়ানো। বিকেলের ম্রিয়মাণ আলোয় যখন রতন তাদের পুরোনো পৈতৃক ভিটায় এসে দাঁড়াল, তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল। বিশাল এক উঠোন, তার চারপাশে সেকেলে নকশার টিনের ঘর। উঠোনের এক কোণে একটা প্রকাণ্ড শ্যাওলা ধরা ছাতিম গাছ ডালপালা মেলে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন সে এই পরিত্যক্ত বাড়ির একমাত্র পাহারাদার।
বাড়ির কেয়ারটেকার হিসেবে এতকাল দেখাশোনা করছিল গ্রামেরই এক বৃদ্ধ, নাম এসহাক আলী। বয়সের ভারে লোকটার মেরুদণ্ড ধনুকের মতো বেঁকে গেছে। রতনকে দেখে সে ফোকলা দাঁতে হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু তার ঘোলাটে চোখে একটা চাপা উদ্বেগের ছায়া রতনের নজর এড়াল না।
“ছোটন বাবু, আপনে তো এইহানে বেশিদিন থাকবেন না, তাই না?” এসহাক আলী রতনের সুটকেসটা ঘরের ভেতর রাখতে রাখতে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
“না এসহাক চাচা। জমির কাগজপত্র ঠিকঠাক করে, খদ্দের পেলেই আমি ঢাকা ফিরে যাব। বড়জোর তিন-চার দিন। কেন, কোনো সমস্যা?” রতন চশমার ফাঁক দিয়ে তাকাল।
এসহাক আলী এদিক-ওদিক তাকিয়ে গলা নামিয়ে বলল, “সমস্যা নাই বাবু। তয় এই গেরামের বাতাস এখন আর আগের মতো নাই। রাইত হইলে গেরামটা কেমন যেন মরা মাইনষের মতো চুপ অইয়া যায়। আপনে সদর ঘরেই ঘুমাইবেন। আর পুব দিকের ওই চালাঘরটার দিকে ভুলেও যাইবেন না।”
রতন পুব দিকের চালাঘরটার দিকে তাকাল। ওটা তাদের পুরোনো ‘তাঁতঘর’। দাদার আমলে ওই ঘরে দিনরাত তাঁতের খটখট শব্দ শোনা যেত। ঘরটার দরজায় একটা বিশাল মরিচা ধরা তালা ঝুলছে।
“তাঁতঘরের আবার কী হলো?
ওটা তো আমি কালই খুলব। ভেতরে পুরোনো সেগুন কাঠের তাঁত আছে, বেচলে ভালো দাম পাওয়া যাবে।”
এসহাক আলীর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে রতনের হাত চেপে ধরে বলল, “দোহাই আপনের বাবু! ওই ঘরের তালা খুলবেন না। আপনের দাদায় মরার আগে ওই তালা মাইরা আমারে কইয়া গেছিল, কেউ যেন ওই ঘরে না ঢোকে। ওইহানে যেই তাঁত আছে, সেইটা সাধারণ কাঠের না। ওইটা অভিশপ্ত।”
শহরের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত রতন এসব কথায় কান দিল না। সে হেসে উড়িয়ে দিল এসহাক আলীর সাবধানবাণী। তার মতে, গ্রামের মানুষের মগজে এসব ভূত-প্রেতের গালগল্প ছাড়া আর কিছু নেই। এসহাক আলী আর কিছু না বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেল।
প্রথম রাতটা বেশ গুমোট কাটল। লোডশেডিংয়ের কারণে কারেন্ট ছিল না। হারিকেনের ম্লান আলোয় রতন বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছিল। বাতাসে একটা অদ্ভুত গন্ধ—পুরোনো সুতো, মাড় আর স্যাঁতস্যাঁতে মাটির গন্ধ।
রাত তখন হয়তো আড়াইটা। চারপাশ নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে আছে। হঠাৎ একটা শব্দে রতনের তন্দ্রা টুটে গেল।
খট… খট… ঠাস! খট… খট… ঠাস!
রতন বিছানায় উঠে বসল। শব্দটা খুব পরিচিত। যারা তাঁতি পল্লীতে বড় হয়েছে, তারা এই শব্দ ভুলতে পারে না। মাকু (Shuttle) এপাশ থেকে ওপাশে যাওয়ার শব্দ আর মাকড় দিয়ে সুতো ঠুকে দেওয়ার শব্দ। কেউ একজন খুব দ্রুতগতিতে তাঁত চালাচ্ছে।
কিন্তু শব্দটা আসছে পুব দিকের সেই বন্ধ তাঁতঘর থেকে!
রতনের মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। এই মাঝরাতে, বন্ধ ঘরে কে তাঁত চালাবে? চোর ঢুকল নাকি? কিন্তু চোর তো জিনিসপত্র চুরি করবে, সে তাঁত চালাতে যাবে কেন?
সাহস সঞ্চয় করে রতন টর্চলাইটটা হাতে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ছাতিম গাছের পাতাগুলো বাতাসে মৃদু কাঁপছে। শব্দটা তখনো একটানা চলছে—খট… খট… ঠাস!
রতন পা টিপে টিপে তাঁতঘরের দিকে এগোল। দরজার কাছে পৌঁছাতেই শব্দটা হঠাৎ থেমে গেল। যেন ভেতরের মানুষটা বুঝতে পেরেছে বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। রতন টর্চের আলো ফেলল দরজায়। মরিচা ধরা তালাটা ঠিক জায়গাতেই ঝুলছে। তালা ভাঙার কোনো লক্ষণ নেই।
তাহলে ভেতরে ঢুকল কে?
রতন দরজার একটা ফাঁক দিয়ে ভেতরে আলো ফেলার চেষ্টা করল, কিন্তু ধুলো আর মাকড়সার জালের কারণে কিছুই দেখা গেল না। সে নিজেকে বোঝাল, হয়তো বড় কোনো ইঁদুর বা বিড়াল পুরোনো কাঠের ওপর লাফালাফি করছে, তাই ওরকম শব্দ হয়েছে। সে দ্রুত পায়ে ঘরে ফিরে এল। কিন্তু সে রাতে তার আর ঘুম হলো না।
পরদিন সকালে রতন প্রথমেই এসহাক আলীকে ডেকে পাঠাল। তার হাতে একটা হাতুড়ি আর শাবল।
“তালা ভাঙছেন ক্যান বাবু? আমি তো আপনেরে মানা করছিলাম!” এসহাক আলী আতঙ্কে কেঁদে ফেলার মতো অবস্থা করল।
“কাল রাতে আমি ওই ঘর থেকে শব্দ পেয়েছি। ভেতরে কেউ ঢুকেছে কিনা সেটা আমাকে দেখতে হবে,” রতন হাতুড়ি দিয়ে সজোরে তালায় আঘাত করতে করতে বলল।
কয়েক ঘা দেওয়ার পরই পুরোনো তালাটা ভেঙে মাটিতে পড়ে গেল। রতন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
ঘরটা বেশ বড়। জানালাগুলো বহু বছর ধরে বন্ধ থাকায় ভেতরে এক দমবন্ধ করা ভ্যাপসা গন্ধ। ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা আছে একটা বিশাল আকৃতির প্রাচীন তাঁত। কালো, তেলতেলে কাঠের তৈরি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুরো ঘরে পুরু ধুলোর আস্তরণ থাকলেও, তাঁতের মেশিনটার ওপরে কোনো ধুলো নেই! যেন কেউ প্রতিদিন এটা পরিষ্কার করে।
কিন্তু রতনের চোখ আটকে গেল তাঁতের রোলারের দিকে।
রোলারের সাথে ঝুলে আছে একেবারে ধবধবে সাদা, সদ্য বোনা কয়েক ইঞ্চি কাপড়। কাপড়ের বুনন এত নিখুঁত আর মিহি যে আধুনিক কোনো কারখানাও এমন কাপড় বানাতে পারবে না।
“এসহাক চাচা, এই কাপড় কোথা থেকে এল?” রতন অবাক হয়ে জানতে চাইল।
এসহাক আলী ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিল। সে ভেজা গলায় বলল, “এইটা কাফনের কাপড় বাবু। ওই তাঁত নিজে নিজে কাপড় বোনে। আর যখনই বোনে, এই গেরামে কারও না কারও মরণ ঘনাইয়া আহে।”
রতন ধমক দিয়ে উঠল, “কী আজেবাজে বকছেন! কোনো মানুষ ঢুকে এই কাজ করেছে। কিন্তু কে করল, আর কেন করল, সেটাই তো বুঝছি না।”
এসহাক আলী শূন্য দৃষ্টিতে তাঁতের দিকে তাকিয়ে বলল, “কোনো জ্যান্ত মাইনষে এই তাঁত চালাইতে পারে না বাবু। এই তাঁতের ইতিহাস অনেক পুরানা। আপনের পরদাদা, কদম আলী এই তাঁত বানাইছিল। সে আছিল এই তল্লাটের সবচেয়ে বড় কারিগর। কিন্তু তার লোভ আছিল অনেক। একদিন এক সাধু আইসা তারে একটা সুতা দিয়া কইছিল, এই সুতা দিয়া কাপড় বুনলে সেই কাপড় যেই পরব, সে অমর অইয়া যাইব। কিন্তু শর্ত আছিল, কাপড় বোনার সময় কদম আলী কারও লগে কথা কইতে পারব না।”
বৃদ্ধ দম নেওয়ার জন্য একটু থামল।
রতন মনোযোগ দিয়ে শুনছে, যদিও সে এসব বিশ্বাস করে না।
“টানা সাত দিন সাত রাইত না খাইয়া কদম আলী কাপড় বুনতে আছিল। কিন্তু শেষ রাইতে তার ছোট মাইয়াটা আইসা তারে ডাক দ্যায়। কদম আলী ভুল কইরা মাইয়ার লগে কথা কইয়া ফেলে। সাথে সাথে ওই সুতা সাপের মতো জ্যান্ত অইয়া কদম আলীর মাইয়ারে পেঁচাইয়া ধইরা মাইরা ফেলে। সেই থিকা এই তাঁত অভিশপ্ত। কদম আলী পাগল অইয়া গলার ফাঁস দিয়া মরছিল। তারপর থিকা এই তাঁতে যেই বসছে, তার আর রক্ষা নাই। আপনের দাদা অনেক তান্ত্রিক ডাইকা এই ঘর বন্ধ করছিল। আপনে আইজ সেই তালা ভাইঙা সর্বনাশ ডাকলেন।”
রতন একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। “গল্পটা ভালো বানিয়েছেন এসহাক চাচা। কিন্তু আমি এসব বিশ্বাস করি না। আজ বিকেলেই আমি লোক ডেকে এই কাঠগুলো বেচে দেব।”
কিন্তু সেদিন বিকেলে আকাশ কালো করে ধেয়ে এল কালবৈশাখী ঝড়।
প্রচণ্ড ঝড়ে মনে হলো পুরো ভবানীপুর গ্রাম যেন উড়ে যাবে। আকাশ চিরে ঘনঘন বিদ্যুতের ঝলকানি আর কানফাটানো বজ্রপাত। মুষলধারে বৃষ্টির কারণে কোনো কাঠুরে বা ক্রেতা আসতে পারল না। রতন বাধ্য হয়ে ঘরের ভেতর আটকা পড়ল।
সন্ধ্যা নামার পর থেকেই পরিবেশটা আরও ভয়ানক হয়ে উঠল। কারেন্ট তো নেই-ই, এমনকি ঝড়ের গোঙানির কারণে বাইরের কোনো শব্দও শোনা যাচ্ছে না। রতন ড্রয়িংরুমে বসে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে বই পড়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার মন বারবার ছুটে যাচ্ছিল পুব দিকের সেই তাঁতঘরের দিকে।
রাত যখন এগারোটা, ঝড়ের তীব্রতা একটু কমল। শুধু একটানা বৃষ্টি পড়ছে। আর ঠিক তখনই, বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে রতনের কানে ভেসে এল সেই ভয়ংকর শব্দটা।
খট… খট… ঠাস! খট… খট… ঠাস!
আজ শব্দটা অনেক বেশি স্পষ্ট, অনেক বেশি দ্রুত। মনে হচ্ছে যেন কেউ উন্মাদের মতো তাঁত চালাচ্ছে।
রতনের কপালে ঘাম জমতে শুরু করল। আজ তো তাঁতঘরের কোনো তালা নেই! দরজাটা শুধু ভেজানো আছে। সে একটা ভারী টর্চলাইট আর একটা লোহার রড হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে দরজার দিকে পা বাড়াল। তার বৈজ্ঞানিক মন বলছে, আজ সে ওই চোর বা বাটপাড়টাকে হাতেনাতে ধরবেই।
বৃষ্টির ভেতর দিয়ে হেঁটে সে তাঁতঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজাটা সামান্য ফাঁকা। ভেতর থেকে একটানা শব্দ আসছে।
রতন সজোরে একটা লাথি মেরে দরজাটা পুরো খুলে দিল এবং সাথে সাথে টর্চের তীব্র আলো ফেলল ঘরের ঠিক মাঝখানে।
যা সে দেখল, তাতে তার গলার কাছে একটা আর্তনাদ আটকে গেল। তার হাত থেকে লোহার রডটা খসে পড়ল মাটিতে।
তাঁতের সামনে একটা জলজ্যান্ত অবয়ব বসে আছে।
অবয়বটার কোনো শরীর নেই। শুধু একটা জীর্ণ, শতচ্ছিন্ন সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা একটা কঙ্কালসার কাঠামো। তার হাত দুটো অস্বাভাবিক লম্বা, আঙুলগুলোতে কোনো মাংস নেই, শুধু সাদা হাড়। সেই হাড়ের আঙুলগুলো অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে তাঁতের সুতোগুলো নাড়াচাড়া করছে। মাকুটা এপাশ-ওপাশ ছুটছে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্যটা ছিল মাকুটা। সেটা কোনো কাঠের তৈরি ছিল না। ওটা ছিল মানুষের একটা পায়ের হাড়, যাকে ঘষে ঘষে মাকুর আকার দেওয়া হয়েছে।
রতনের পা দুটো যেন মাটির সাথে গেঁথে গেছে। সে চাইলেও চোখ ফেরাতে পারছে না। অবয়বটা একটানা তাঁত চালিয়ে যাচ্ছে। রোলারের সাথে ঝুলে থাকা সেই সাদা কাপড়টা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে।
হঠাৎ, অবয়বটা তাঁত চালানো থামিয়ে দিল।
ঘরের ভেতর নেমে এল এক জমাট, হাড়কাঁপানো নিস্তব্ধতা। অবয়বটা ধীরে ধীরে তার মাথাটা (যা কাপড়ে ঢাকা ছিল) ঘুরাল রতনের দিকে। কাপড়ের ফাঁক দিয়ে রতন দেখল, সেখানে কোনো মুখ নেই, শুধু দুটো গভীর, অন্ধকার গর্ত জ্বলজ্বল করছে।
অবয়বটা তার হাড়ের আঙুল দিয়ে বোনা কাপড়টার দিকে ইশারা করল।
রতন মোহগ্রস্তের মতো, যেন কোনো অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতো, পা টেনে টেনে এগিয়ে গেল তাঁতের দিকে। টর্চের আলো ফেলল সদ্য বোনা সেই কাপড়ের ওপর।
ধবধবে সাদা কাফনের কাপড়। কিন্তু সেই কাপড়ের মাঝখানে লাল সুতো দিয়ে একটা নকশা বোনা হয়েছে।
রতন ভালো করে তাকাতেই তার দম বন্ধ হয়ে এল। লাল সুতোর নকশাটা কোনো সাধারণ ফুল বা লতাপাতার নয়। ওটা একটা মানুষের মুখের অবয়ব।
এবং মুখটা রতনের নিজের!
অবিশ্বাস্য সূক্ষ্মতায় বোনা সেই মুখের চোখদুটো যেন রতনের দিকে তাকিয়ে এক পৈশাচিক হাসি হাসছে।
“এই কাপড় তোর জন্য তৈরি…”
শব্দটা কোনো মানুষের গলা থেকে আসেনি। মনে হলো যেন হাজার হাজার পুরনো, শুকনো সুতো একসাথে ঘষা খেয়ে একটা ফিসফিসে আওয়াজ তৈরি করল।
রতনের সম্বিত ফিরে এল। সে চিৎকার করে উল্টো দিকে দৌড়াতে চাইল। কিন্তু তার আগেই তাঁতের ভেতর থেকে অসংখ্য সাদা সুতো সাপের মতো কিলবিল করে বেরিয়ে এল। সুতোগুলো চোখের পলকে রতনের পা, হাত আর গলা আষ্টেপৃষ্ঠে পেঁচিয়ে ধরল।
সুতোগুলো এতই শক্ত আর ধারালো যে রতনের চামড়া কেটে রক্ত বের হতে লাগল। অবয়বটা ধীরে ধীরে তার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে তার লম্বা, হাড়ের হাতটা রতনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
“অভিশপ্ত বুনন কখনও অসম্পূর্ণ থাকে না… রক্ত ছাড়া সুতোর রং গাঢ় হয় না…” ফিসফিসে আওয়াজটা আবার শোনা গেল।
রতন আপ্রাণ চেষ্টা করল সুতোর বাঁধন ছিঁড়তে, কিন্তু যত সে নড়াচড়া করছে, সুতোগুলো তত বেশি করে তার মাংসের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। তার শ্বাস আটকে আসছে। অবয়বটা তার হাড়ের মাকুটা রতনের বুকের দিকে তাক করে এগিয়ে আসছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে রতনের চোখ পড়ল তার হাত থেকে পড়ে যাওয়া টর্চলাইটের পাশে রাখা একটা কেরোসিনের বোতলের দিকে। বিকেলে সে যখন ঘর দেখতে এসেছিল, তখন ওটা সাথেই এনেছিল।
তার ডান হাতটা এখনো কিছুটা মুক্ত। সে মরিয়া হয়ে শরীরটাকে বাঁকিয়ে ডান হাত দিয়ে বোতলটা তুলে নিল। দাঁত দিয়ে ছিপি খুলে বোতলের পুরো কেরোসিনটা সে অবয়বটা আর তাঁতের মেশিনের ওপর ছুঁড়ে মারল।
কেরোসিনের গন্ধে অবয়বটা মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল।
রতনের পকেটে সব সময় একটা গ্যাস লাইটার থাকে। সে কাঁপা কাঁপা হাতে পকেট থেকে লাইটারটা বের করে তাতে জ্বালিয়ে দিল।
লাইটারের ছোট্ট আগুনের শিখাটা কেরোসিনে ভেজা সুতোগুলোর সংস্পর্শে আসতেই একটা বিকট বিস্ফোরণের মতো শব্দ হলো। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল পুরো তাঁতঘরে।
আগুনের লেলিহান শিখা অবয়বটাকে গ্রাস করতেই একটা কানফাটানো, অমানুষিক আর্তনাদ ঘরটাকে কাঁপিয়ে তুলল। মনে হলো যেন একসাথে শত শত মানুষ নরকের আগুনে পুড়ে চিৎকার করছে।
রতনের শরীরের সুতোগুলো আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতেই তার বাঁধন আলগা হয়ে গেল। সে এক লাফে দরজার বাইরে এসে পড়ল।
ততক্ষণে পুরো তাঁতঘর আগুনে জ্বলছে। আগুনের শিখা ছাদ ফুঁড়ে আকাশের দিকে উঠছে। বৃষ্টি পড়ছে, কিন্তু সেই অলৌকিক আগুন নেভানোর ক্ষমতা বৃষ্টির নেই। রতন উঠোনের কাদামাটিতে পড়ে হাঁপাতে লাগল। তার সারা শরীর রক্তাক্ত, চোখের সামনে পৃথিবীটা ঘুরছে।
শেষবারের মতো জ্ঞান হারানোর আগে সে দেখল, আগুনের ভেতর থেকে সেই অবয়বটা দুই হাত তুলে আকাশের দিকে গোঙাচ্ছে, আর তার বোনা সেই লাল মুখের কাফনের কাপড়টা ধীরে ধীরে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।
…
পরদিন সকালে গ্রামের মানুষের কোলাহলে রতনের জ্ঞান ফেরে। তাঁতঘরটা পুরোপুরি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সেখানে শুধু কিছু পোড়া কাঠ আর কালো ছাই পড়ে আছে। এসহাক আলী রতনের পাশে বসে অঝোরে কাঁদছে।
রতন আর এক মুহূর্তও সেই গ্রামে থাকেনি। পৈতৃক ভিটা, জমিজমা—সবকিছু ফেলে রেখে সে সেদিনই ঢাকায় ফিরে আসে।
ঘটনার পর আজ প্রায় পাঁচ বছর কেটে গেছে। রতন এখন পুরোপুরি সুস্থ। বিয়ে করেছে, একটা কর্পোরেট কোম্পানিতে ভালো চাকরি করে। ভবানীপুরের সেই অভিশপ্ত রাতের কথা সে একটা দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু কিছু দুঃস্বপ্ন কখনও পিছু ছাড়ে না।
মাঝে মাঝে, বিশেষ করে বর্ষাকালের কোনো গভীর রাতে, যখন ঢাকা শহরের কোলাহল শান্ত হয়ে আসে, রতন তার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের এসি রুমে শুয়েও একটা মৃদু শব্দ শুনতে পায়।
শব্দটা খুব চেনা।
খট… খট… ঠাস! খট… খট… ঠাস!
রতন তখন ঘামে ভিজে বিছানায় উঠে বসে। তার চোখ চলে যায় ঘরের কোণে রাখা ওয়ারড্রোবের দিকে। এবং পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে মাঝে মাঝেই তার ইস্ত্রি করা শার্ট বা প্যান্টের পকেটে আবিষ্কার করে একটা ছোট্ট, ধবধবে সাদা সুতো… যার এক প্রান্তে এক ফোঁটা গাঢ়, শুকনো রক্তের দাগ লেগে থাকে।
অদৃশ্য সেই তাঁতি হয়তো আজও বুনন চালিয়ে যাচ্ছে, রতনের শেষ কাফনের অপেক্ষায়।