শেষ রাতের কান্না
ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় এক দশক আগের। সময়ের হিসাবে দশ বছর খুব দীর্ঘ কোনো সময় নয়, কিন্তু স্মৃতির পাতায় কিছু কিছু রাত এমনভাবে গেঁথে থাকে, যা যুগের পর যুগ পার হলেও অমলিন থেকে যায়। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আমাদের তারুণ্যের সেই দিনগুলো কাটত ক্লাস, আড্ডা, আর রাত জেগে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বোনার মধ্য দিয়ে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো লাল ইটের হোস্টেলটা ছিল নানা অদ্ভুত গল্প আর রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু। সেই হোস্টেলের চারতলার একেবারে শেষ মাথার একটা রুমে থাকতাম আমি।
আমার একজন খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল—রায়হান। রায়হান সাধারণ ছেলেদের মতো ছিল না। অত্যন্ত শান্ত, ধীরস্থির এবং অন্তর্মুখী স্বভাবের এক যুবক। সে খুব একটা কথা বলত না, নিজের জগতেই বেশি ডুবে থাকত। কিন্তু ওর একটা অদ্ভুত গুণ ছিল। ও যখন কোনো গল্প বলত, চারপাশের সময় যেন থমকে দাঁড়াত। ওর বলার ভঙ্গি, গলার গম্ভীর স্বর আর শব্দচয়ন এতটাই নিখুঁত ছিল যে, শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে বাধ্য হতো। তবে মাঝে মাঝে সে এমন কিছু গল্প বলত, যা শুনলে আক্ষরিক অর্থেই গায়ের লোম খাড়া হয়ে যেত, মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যেত এক শীতল বরফের স্রোত।
তেমনই এক হাড়হিম করা শীতের রাত। বাইরে তখন ঘন কুয়াশা, হাত দুয়েক দূরের জিনিসও ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। চারপাশের পৃথিবী যেন এক গভীর, নিস্তব্ধ চাদরে মুড়িয়ে আছে। হোস্টেলের ছাদের এক কোণায় আমরা দুজন বসে ছিলাম। রায়হানের হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট, যার ধোঁয়া কুয়াশার সাথে মিশে এক অদ্ভুত আবহের সৃষ্টি করছিল। অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর, সে হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে ছিল এক গভীর ক্লান্তি আর অজানা আতঙ্ক। সেই রাতেই সে আমাকে তার জীবনের—বা বলা ভালো, তার পরিবারের জীবনের—সবচেয়ে ভয়ংকর, সবচেয়ে অবর্ণনীয় ঘটনাটা বলেছিল।
ঘটনাটা ঘটেছিল তার বড় বোন সুমাইয়ার সাথে।
সুমাইয়া আপার তখন সদ্য বিয়ে হয়েছে। নতুন জীবনের রঙিন স্বপ্ন তার চোখেমুখে। তার স্বামী আরিফ ভাই পেশায় ছিলেন একজন ল্যাব টেকনিশিয়ান। সরকারি চাকরিতে সদ্য যোগ দিয়েছেন। পোস্টিং হয়েছিল দেশের দক্ষিণাঞ্চলের এক মফস্বল শহরের একটি ছোট সরকারি হাসপাতালে। চাকরির সুবিধার জন্য এবং যাতায়াতের ঝক্কি এড়াতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া একটি পুরোনো স্টাফ কোয়ার্টারেই তারা সংসার পেতেছিলেন।
জায়গাটা শহরের একেবারে প্রান্তে অবস্থিত। মূল শহরের কোলাহল, গাড়ির হর্ন বা মানুষের ব্যস্ততা সেখানে পৌঁছাত না। কোয়ার্টারের চারপাশটা ছিল বিশাল সব পুরোনো গাছে ঘেরা—বট, অশ্বত্থ, আর কড়ই গাছের এমন ঘন জঙ্গল ছিল যে, দিনের বেলাতেও সেখানে সূর্যের আলো ঠিকমতো পৌঁছাতে পারত না। হাসপাতালের চারপাশের ফাঁকা জমিগুলোতে বুনো ঝোপঝাড় গজিয়ে উঠেছিল। সব মিলিয়ে জায়গাটার মধ্যে এমন একটা দমবন্ধ করা অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করত, যা সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের অস্বস্তির জন্ম দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
হাসপাতালটা ছিল অনেক পুরোনো। স্থানীয়দের মুখে শোনা যেত, এটি ব্রিটিশ আমলে তৈরি। দালানের স্থাপত্যশৈলী দেখলেও তা বোঝা যেত। উঁচু সিলিং, মোটা মোটা লাল ইটের দেওয়াল, আর খিলানযুক্ত বিশাল সব জানালা। এত বছর পার হয়ে যাওয়ার কারণে বিল্ডিংয়ের জায়গায় জায়গায় গভীর ফাটল ধরেছিল, দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে ভেতর থেকে ইট উঁকি দিচ্ছিল। করিডোরগুলো ছিল অনেক দীর্ঘ আর অন্ধকারাচ্ছন্ন। সেখানে পুরোনো আমলের টিউবলাইটগুলো জ্বলত ঠিকই, কিন্তু তাদের সাদা, ম্লান আলো যেন অন্ধকারকে দূর করার বদলে আরও বেশি ভৌতিক করে তুলত। দিনের বেলাতেই হাসপাতালটার ভেতরে কেমন যেন একটা স্যাঁতস্যাঁতে, গুমোট পরিবেশ থাকত। আর রাত নামলে তো কথাই নেই! পুরো জায়গাটা যেন তার রূপ পরিবর্তন করে ফেলত। প্রতিটি শব্দ সেখানে প্রতিধ্বনিত হতো বহুগুণ হয়ে।
সুমাইয়া আপা তখন তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। মাতৃত্বের প্রথম পর্যায়ের আনন্দ আর একই সাথে শারীরিক দুর্বলতা তাকে ঘিরে রেখেছিল। আরিফ ভাই তাকে খুব যত্নে রাখতেন।
নতুন পরিবেশে প্রথম কয়েক সপ্তাহ সবকিছু একদম স্বাভাবিকভাবেই কেটেছিল। দিনের বেলা আরিফ ভাই ডিউটিতে চলে যেতেন, সুমাইয়া আপা ঘরদোর গুছিয়ে, বই পড়ে বা সেলাই করে সময় কাটাতেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পার হওয়ার পর থেকেই তাদের সেই নিভৃত কোয়ার্টারে অদ্ভুত সব অকল্পনীয় ঘটনা ঘটতে শুরু করল।
সুমাইয়া আপা খেয়াল করলেন, প্রতিদিন গভীর রাতে একটা নির্দিষ্ট সময়ে তার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। সময়টা হলো রাত ঠিক তিনটা। কোনো কারণ ছাড়াই তিনি হঠাৎ ধড়মড় করে জেগে উঠতেন। তার মনে হতো, বাইরের নিস্তব্ধতা চিরে একটা তীক্ষ্ণ শব্দ তার কানে এসে আঘাত করছে।
শব্দটা ছিল কান্নার।
একটা শিশুর বুকফাটা আর্তনাদ।
শুরুতে সুমাইয়া আপা খুব একটা পাত্তা দেননি। তিনি নিজেকে বুঝিয়েছিলেন, হয়তো হাসপাতালের কোনো শিশুর কান্না। কোয়ার্টারের পাশেই তো হাসপাতালের মাতৃসদন ওয়ার্ড (Maternity Ward)। হয়তো কোনো নবজাতক অসুস্থ, অথবা খিদে পেয়ে কাঁদছে। রাতের বেলা চারপাশ নীরব থাকে বলে শব্দটা হয়তো অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার কারণে তার নিজের ভেতরেও একটা অদ্ভুত সংবেদনশীলতা কাজ করছিল।
কিন্তু এই যুক্তিটা বেশিদিন টিকল না। কয়েকদিন টানা সেই একই সময়ে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর, সুমাইয়া আপা খুব মনোযোগ দিয়ে কান্নার শব্দটার উৎস বোঝার চেষ্টা করলেন। তিনি জানালার কাছে কান পেতে বুঝতে পারলেন, শব্দটা কিছুতেই হাসপাতালের মাতৃসদন থেকে আসছে না। মাতৃসদন ছিল তাদের কোয়ার্টারের সামনের দিকে, বেশ কিছুটা দূরে।
কিন্তু কান্নার এই করুণ, তীক্ষ্ণ শব্দটা ভেসে আসছে ঠিক বিপরীত দিক থেকে। কোয়ার্টারের পেছনের দিক থেকে।
কোয়ার্টারের ঠিক পেছনেই ছিল হাসপাতালের পুরোনো মর্গ।
সেই মর্গটা বহু বছর আগে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এখন সেখানে কেউ ভুলেও পা মারে না। মর্গের বিল্ডিংটা মূল হাসপাতাল থেকে একটু বিচ্ছিন্ন। চারদিকে শেওলা ধরা দেওয়াল, লোহার বড় দরজাটায় পুরু মরিচা ধরেছে, জানালার কাঁচগুলো ভেঙে একাকার। চারপাশটা ঘিরে রেখেছে বিশাল বিশাল প্রাচীন সব বটগাছ, যাদের ঝুরিগুলো সাপের মতো ঝুলে থাকে মর্গের ছাদ আর দেওয়াল ছুঁয়ে। দিনের বেলাতেও জায়গাটা দেখলে বুক কেঁপে ওঠে, আর রাতের বেলা তো সেটা এক সাক্ষাৎ বিভীষিকা।
একদিন সকালে সকালের নাশতা করার সময় সুমাইয়া আপা অত্যন্ত দ্বিধা নিয়ে তার স্বামী আরিফ ভাইকে বিষয়টা খুলে বললেন। তিনি জানালেন, প্রতিদিন রাত তিনটায় তিনি মর্গের দিক থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পান।
আরিফ ভাই ছিলেন বিজ্ঞানের ছাত্র। ল্যাবরেটরিতে মাইক্রোস্কোপ আর টেস্টটিউব নিয়ে যার সারাদিন কাটে, ভূত-প্রেত বা অতিপ্রাকৃত কোনো কিছুতে তার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস ছিল না। তিনি সুমাইয়া আপার কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খুব সাবলীল ভঙ্গিতে বললেন,
“আরে সুমাইয়া, তুমি এসব কী ভাবছ? রাতে অনেক সময় বিড়াল বা শেয়ালের আওয়াজ, এমনকি কিছু কিছু নিশাচর পাখির ডাকও দূর থেকে বাচ্চার কান্নার মতো শোনায়। আর তুমি তো জানোই, জায়গাটা কেমন জঙ্গলের মতো। তাছাড়া তুমি প্রেগন্যান্ট, এই সময় মেয়েদের হরমোনাল চেঞ্জের কারণে একটু বেশি স্ট্রেস হয়, হ্যালুসিনেশনও হতে পারে। এসব নিয়ে একদম ভাববে না।”
আরিফ ভাইয়ের কথাটা সুমাইয়া আপার কাছেও তখন বেশ যুক্তিসঙ্গতই মনে হলো। বিজ্ঞানের যুক্তি দিয়ে ভয়কে জয় করার চেষ্টা করলেন তিনি। নিজেকে বোঝালেন, হয়তো তার মনই তার সাথে খেলা করছে।
কিন্তু সেই রাতেই তার সব যুক্তি, সব সাহস তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।
আবার রাত তিনটা। দেওয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দের সাথে মিশে গেল সেই মর্মান্তিক আওয়াজটা।
একটা শিশুর কান্না।
তবে এবার শব্দটা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট। আগের দিনগুলোতে মনে হতো কান্নাটা বাতাসে ভেসে দূর থেকে আসছে। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে যেন কেউ খুব কাছ থেকে কাঁদছে। কান্নার ভেতরে এমন একটা তীক্ষ্ণ বেদনা ছিল, যা শুনলে যে কোনো মানুষের বুক হু হু করে উঠবে।
সুমাইয়া আপা আর শুয়ে থাকতে পারলেন না। বিছানায় উঠে শক্ত হয়ে বসে রইলেন তিনি। তার পাশে আরিফ ভাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সুমাইয়া আপা তাকে ডাকতে গেলেন, কিন্তু কেন যেন গলা দিয়ে স্বর বের হলো না। তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন এক অজানা, আদিম আতঙ্কে অস্থির লাগছিল।
হঠাৎ তার মনে হলো—কান্নাটা কেবল একটা শব্দ নয়। কান্নাটা যেন তাকে ডাকছে!
এই অদ্ভুত, সম্মোহনী অনুভূতিটা তিনি আগে কখনও পাননি। মনে হচ্ছিল, কেউ একজন প্রবল কষ্টে তার সাহায্য চাইছে, তাকে বারবার নিজের কাছে টানছে। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই সুমাইয়া আপা বিছানা থেকে নামলেন। পা দুটোর উপর যেন তার নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তিনি ধীরে ধীরে, অনেকটা ঘোরের মধ্যে হেঁটে ঘরের জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।
তাদের শোবার ঘরের এই জানালাটা দিয়ে পেছনের সেই পরিত্যক্ত মর্গটা সরাসরি দেখা যায়।
বাইরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। আকাশে চাঁদ নেই, কেবল দূরের একটা ল্যাম্পপোস্টের ম্লান হলুদ আলো গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে মর্গের সামনের উঠোনে এসে পড়েছে।
সুমাইয়া আপা জানালার গ্রিল ধরে বাইরের দিকে তাকালেন। প্রথমে কিছুই চোখে পড়ল না। কেবল গভীর অন্ধকার আর দমকা হাওয়ায় গাছের ডালপালার দুলুনি। কিন্তু হঠাৎ তার দৃষ্টি আটকে গেল মর্গের সেই মরিচা ধরা, বিশাল লোহার দরজাটার সামনে।
সেখানে একটা ছোট ছায়া দাঁড়িয়ে আছে।
ছায়াটা খুব ছোট। উচ্চতায় হয়তো আড়াই বা তিন ফুটের বেশি হবে না। শরীরের গড়ন দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, ওটা একটা বাচ্চার ছায়া। কিন্তু সেখানে কোনো মানুষ নেই, কেবল জমাট বাঁধা অন্ধকারের মতো একটা অবয়ব।
সুমাইয়া আপার সারা শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল। শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল আতঙ্কের এক শীতল স্রোত। গায়ের প্রতিটি লোম খাড়া হয়ে উঠল। তিনি শ্বাস নিতে ভুলে গেলেন।
অবিশ্বাসে তিনি চোখ কচলে আবার তাকালেন।
কিছুই নেই।
মর্গের সামনের জায়গাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা। কেবল হাওয়ায় একটা শুকনো পাতা উড়ে গেল।
তিনি দ্রুত জানালা বন্ধ করে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বিছানায় ফিরে এলেন। লেপের নিচে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে সারা রাত থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। নিজেকে বারবার বোঝাতে লাগলেন—সবই হয়তো তার দুর্বল মস্তিষ্কের কল্পনা, আরিফ ঠিকই বলেছিল।
কিন্তু ঘটনাটা এখানেই শেষ হওয়ার ছিল না।
পরদিন দুপুরবেলা। আরিফ ভাই ডিউটিতে। সুমাইয়া আপা একটু ভালো লাগার জন্য হাসপাতালের ভেতরের বাগানে হাঁটতে গিয়েছিলেন। সেখানে হাসপাতালের এক অতি বৃদ্ধা আয়া বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল। আয়ার বয়স অনেক, চামড়া কুঁচকে গেছে, দাঁতগুলো পানের রসে লাল। সে এই হাসপাতালে কাজ করছে গত চল্লিশ বছর ধরে।
কথার ফাঁকে সুমাইয়া আপা খুব সাবধানে, যেন কিছুই হয়নি এমন ভান করে, আয়াকে জিজ্ঞাসা করলেন,
“খালা, আপনাদের পেছনের ওই মর্গটা বন্ধ কেন? কাল রাতে ওদিক থেকে কেমন যেন একটা শব্দ শুনলাম।”
মর্গের দিকের কান্নার কথা বলতেই বৃদ্ধা আয়ার মুখের রং ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠল এক গভীর আতঙ্ক। সে দ্রুত এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিল, যেন কেউ তাদের কথা শুনছে কি না। তারপর সুমাইয়া আপার খুব কাছে এসে, প্রায় ফিসফিস করে, কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“ওদিকে রাইতে ভুলেও তাকাইবেন না আপা। ওই দিকের জানালা রাইতে খুইলা রাখবেন না।”
সুমাইয়া আপার বুকটা ধক করে উঠল। তিনি ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলেন, “কেন খালা? কী আছে ওখানে?”
আয়া কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার চোখদুটো যেন অতীতের কোনো ভয়ংকর স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছে। তারপর সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল,
“অনেক বছর আগের কথা আপা। আপনি তখন হয়তো জন্মাইছেন কি না সন্দেহ। এই হাসপাতালে তখন একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটছিল…”
আয়ার বর্ণনা অনুযায়ী, আজ থেকে প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ বছর আগের এক কালবৈশাখীর রাত। প্রচণ্ড ঝড় আর বৃষ্টিতে পুরো হাসপাতাল বিদ্যুৎহীন। জেনারেটরও নষ্ট। সেই রাতে হাসপাতালের মাতৃসদনে তিনজন প্রসূতি মা ভর্তি ছিলেন। কাকতালীয়ভাবে সেই রাতেই তিনজনই সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু ভোরের আলো ফোটার আগেই মাতৃসদনে এক অভাবনীয়, মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। একসাথে, প্রায় একই সময়ে সেই সদ্য জন্ম নেওয়া তিনটা শিশুর মৃত্যু হয়। ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেও কারণ বুঝতে পারেননি। কেউ বলেছিল দম আটকে মারা গেছে, কেউ বলেছিল অজ্ঞাত কোনো ইনফেকশন।
যেহেতু মৃত্যুর কারণ পরিষ্কার ছিল না, তাই নিয়ম অনুযায়ী ময়নাতদন্তের জন্য বাচ্চা তিনটির মৃতদেহ সেই রাতেই মর্গে পাঠানো হয়।
কিন্তু আসল বিভীষিকার শুরু হয় পরদিন সকালে।
ডোমেরা যখন মর্গের তালা খোলে, তখন ভেতরে এক ভয়ংকর দৃশ্য দেখতে পায়। মর্গের বরফের ট্রেগুলো ফাঁকা। সেই তিনটা বাচ্চার লাশ কোথাও নেই! চারদিকে তন্নতন্ন করে খোঁজা হলো, পুলিশ আসল, তদন্ত হলো। কিন্তু মর্গের ভারী লোহার দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ থাকা সত্ত্বেও, ভেতর থেকে বাচ্চাগুলোর মৃতদেহ কীভাবে উধাও হয়ে গেল, তার কোনো ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারল না। সেই রহস্যের আর কোনো কিনারা হয়নি।
আয়া একটা ঢোক গিলে তার গলাটা আরও নামিয়ে বলল,
“সেইদিনের পর থাইকা ওই মর্গটা চিরতরে বন্ধ কইরা দেওয়া হয় আপা। কিন্তু ওই তিন মাসুম বাচ্চার আত্মাগুলা শান্তি পায় নাই। তারা এখনও রাইতে ওইখানে ঘুইরা বেড়ায়। নিজের মায়েগো খোঁজে। মাঝে মাঝেই লোকজন রাইতে ওইদিক থাইকা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ পায়। যারা দেখছে, তারা কেউ বেশিদিন বাঁচে নাই, নাইলে পাগল হইয়া গেছে। আপনি পোয়াতি মানুষ আপা, আপনার শরীরে নতুন জান। ওই অশরীরী ছায়াগুলা পোয়াতি মায়েগো গায়ের গন্ধ পায়। আপনি সাবধানে থাইকেন।”
সুমাইয়া আপা গল্পটা শুনে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। দুপুরের কড়া রোদের মাঝেও তার মনে হলো চারপাশটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে। যদিও আধুনিক যুগে শিক্ষিত ঘরের মেয়ে হিসেবে তিনি এসব আধিভৌতিক গল্প পুরোপুরি বিশ্বাস করতে চাইলেন না, কিন্তু তার অবচেতন মন তাকে বারবার সতর্ক করছিল। আগের রাতের দেখা সেই ছোট ছায়াটার কথা মনে পড়তেই তার বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠল।
সেদিন রাতে সুমাইয়া আপা আরিফ ভাইকে আয়ার বলা গল্পটা শোনালেন। আরিফ ভাই এবারও হেসেই উড়িয়ে দিলেন। বললেন, “আরে ধুর! গ্রামের অশিক্ষিত মানুষদের এসব গালগল্প তুমি বিশ্বাস করছ? ওই পুরোনো দিনে কোনো শেয়াল বা কুকুর হয়তো মর্গে ঢুকে লাশ নিয়ে গিয়েছিল, আর এরা সেটাকে ভূতের গল্প বানিয়ে বসে আছে। তুমি একদম টেনশন করবে না। ঘুমাও।”
সুমাইয়া আপাও চাইলেন আরিফ ভাইয়ের আত্মবিশ্বাসের ছায়ায় নিজের ভয়কে লুকিয়ে রাখতে। কিন্তু সেই রাতেই তাদের জীবনের সমস্ত স্বাভাবিকতা, সমস্ত বৈজ্ঞানিক যুক্তি চিরতরে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল।
রাত তিনটা।
চারদিক নিস্তব্ধ। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল সুমাইয়া আপার।
আবার সেই কান্না।
কিন্তু এবার সুমাইয়া আপার শরীর মুহূর্তের মধ্যে অসাড় হয়ে গেল। কারণ, এবার কান্নার শব্দটা বাইরে থেকে বা মর্গের দিক থেকে আসছে না।
শব্দটা আসছে তাদের নিজেদের ঘরের ভেতর থেকে!
সুমাইয়া আপা চোখ খুলে যা দেখলেন, তাতে তার হৃৎপিণ্ড যেন গলার কাছে এসে আটকে গেল। তিনি দেখলেন, তাদের শোবার ঘরের দরজাটা, যা আরিফ ভাই নিজে ছিটকিনি লাগিয়ে বন্ধ করেছিলেন, তা এখন আধখোলা।
আর সেই আধখোলা দরজার সামনে, আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট্ট ছায়া।
হুবহু আগের রাতের সেই ছায়াটা। তার উচ্চতা হয়তো তিন বছরের একটা বাচ্চার মতো। কিন্তু তার কোনো নির্দিষ্ট অবয়ব নেই, কোনো হাত-পা-মুখ স্পষ্ট নয়। কেবল জমাট বাঁধা এক খণ্ড নিরেট অন্ধকার। ঘরটা যেন মুহূর্তে একটা বরফঘরে পরিণত হয়েছে। সুমাইয়া আপা স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, একটা পচা, স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে।
ছায়াটা এবার স্থির দাঁড়িয়ে থাকল না।
সে ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে সুমাইয়া আপার বিছানার দিকে এগোতে লাগল।
সুমাইয়া আপার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তিনি চাইছেন আরিফ ভাইকে ধাক্কা দিয়ে জাগাতে, তিনি চাইছেন শক্তি দিয়ে একটা চিৎকার করতে। কিন্তু তার শরীর যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে গেছে। বোবায় ধরার মতো এক ভয়ংকর পক্ষাঘাত তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। তার মুখ দিয়ে গোঙানির মতো একটা শব্দ ছাড়া আর কিছুই বের হলো না।
ছায়াটা একদম বিছানার পাশে এসে থামল।
সুমাইয়া আপা চোখ বড় বড় করে সেই শূন্যতার দিকে তাকিয়ে আছেন। তার মনে হলো, সেই ছায়ার ভেতর থেকে দুটো অদৃশ্য চোখ তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে।
তারপর, সেই নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর এক অমানবিক, ফিসফিস করা, করুণ কণ্ঠস্বর বেজে উঠল। স্বরটা যেন এই পৃথিবীর কোনো মানুষের নয়, যেন কোনো পাতালপুরী থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ।
কণ্ঠস্বরটি বলল—
“আমাকে… ফেরত… দাও…”
পরের মুহূর্তেই সুমাইয়া আপার মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো আর এই অকল্পনীয় বিভীষিকার ভার নিতে পারল না। তিনি জ্ঞান হারিয়ে বিছানা থেকে সজোরে নিচে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন।
পতনের ভারী শব্দে ধড়মড় করে ঘুম থেকে জেগে উঠলেন আরিফ ভাই। তিনি তড়িঘড়ি করে বিছানার পাশের সুইচবোর্ড হাতড়ে ঘরের আলো জ্বাললেন।
আলো জ্বলতেই তিনি দেখলেন, সুমাইয়া আপা মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। তার মুখটা ফ্যাকাশে, কপালের কাছে ঘাম জমে আছে।
আরিফ ভাই পাগলের মতো তাকে ডাকতে লাগলেন, চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিলেন। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন সুমাইয়া হয়তো দুর্বলতার কারণে মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। কিন্তু হঠাৎ তার দৃষ্টি গেল ঘরের দরজার দিকে।
দরজাটা ভেতর থেকে ঠিক আগের মতোই ছিটকিনি দিয়ে বন্ধ করা!
তাহলে সুমাইয়া বিছানা থেকে নিচে পড়ল কীভাবে? আর সে এতো ভয়ই বা পেল কেন? আরিফ ভাই চারপাশটা ভালো করে খেয়াল করতে গিয়ে মেঝের দিকে তাকালেন। আর তাকানো মাত্রই তার শিরদাঁড়া দিয়ে এক শীতল স্রোত নেমে গেল। বিজ্ঞানের সব যুক্তি, সব অহংকার এক নিমিষেই ধুলিস্যাৎ হয়ে গেল।
ঘরের মেঝেতে ছোট ছোট, ভেজা পায়ের ছাপ।
যেন কাদাপানিতে পা ডুবিয়ে কোনো তিন-চার বছরের বাচ্চা ঘরের ভেতর হেঁটে বেড়িয়েছে। পায়ের ছাপগুলো দরজার কাছ থেকে শুরু হয়ে একেবারে সুমাইয়া আপার বিছানার পাশ পর্যন্ত এসে থেমেছে। আরিফ ভাই কাঁপতে কাঁপতে নিচু হয়ে সেই ছাপগুলো ছুঁয়ে দেখলেন। সেগুলো আসলেই ভেজা, এবং তা থেকে শেওলা আর পচা জলের একটা উৎকট গন্ধ আসছে। অথচ ঘরের জানালা-দরজা সব ভেতর থেকে বন্ধ। বাইরে থেকে কারও ঢোকার কোনো সম্ভাবনাই নেই।
পরদিন সকালেই সুমাইয়া আপার জ্ঞান ফেরে। তিনি হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন এবং আরিফ ভাইকে সব কথা খুলে বলেন। আরিফ ভাই এবার আর কোনো যুক্তি দেখালেন না। রাতের ওই পায়ের ছাপগুলো তার মগজে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, তিনি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেন—এক মুহূর্তও আর এই অভিশপ্ত কোয়ার্টারে থাকা যাবে না।
তিনি সেদিনই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে একটা ইমার্জেন্সি ছুটির দরখাস্ত দিয়ে প্যাকিং শুরু করেন।
কিন্তু কোয়ার্টার ছেড়ে যাওয়ার আগের রাতে, আরিফ ভাই নিজেই এক ভয়ংকর জিনিসের সম্মুখীন হন।
সেদিন রাতে সুমাইয়া আপাকে কড়া ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছেন আরিফ ভাই। তিনি নিজে জেগে বসে আছেন পাহারায়। রাত তখন আড়াইটার মতো বাজে। হঠাৎ তার মনে হলো, বাইরে বাতাসটা যেন অস্বাভাবিকভাবে ভারী হয়ে গেছে। তিনি কৌতূহলবশত জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন।
তার দৃষ্টি সোজা গিয়ে পড়ল সেই পরিত্যক্ত মর্গের দিকে।
হঠাৎ, বিনা বাতাসে, কোনো মানুষের স্পর্শ ছাড়াই মর্গের সেই ভারী, মরিচা ধরা লোহার দরজাটা একটা বিকট, ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে ধীরে ধীরে খুলে গেল।
আরিফ ভাই দম আটকে তাকিয়ে রইলেন।
অন্ধকার মর্গের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল কয়েকটা ছোট ছোট ছায়া।
একটা না।
দুইটা না।
ঠিক তিনটা।
তিনটি ছোট, অন্ধকার অবয়ব। তারা মর্গের দরজার সামনে এসে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াল। তারপর, কোনো নির্দেশ ছাড়াই, তিনটি ছায়া একসাথে, একই ভঙ্গিতে তাদের মাথাটা ঘুরিয়ে তাকাল আরিফ ভাইয়ের জানালার দিকে।
যদিও তাদের কোনো মুখ বা চোখ ছিল না, কিন্তু আরিফ ভাই স্পষ্ট অনুভব করলেন, তিনটা অশরীরী আত্মা সরাসরি তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের সেই দৃষ্টিতে ছিল এক আদিম, শীতল ক্ষোভ।
আরিফ ভাই আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে পারলেন না। তিনি জানালা বন্ধ করে দিয়ে সোজা বিছানায় এসে বসে রইলেন, হাতে শক্ত করে ধরে রইলেন একটা কোরআন শরিফ। ভোরের আজান না পড়া পর্যন্ত তিনি এক সেকেন্ডের জন্যও চোখের পাতা এক করতে পারেননি।
ভোর হওয়ার সাথে সাথেই, সকালের প্রথম আলো ফুটতেই তারা সব জিনিসপত্র ফেলে রেখে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে সেই শহর ছেড়ে চিরতরে চলে যান।
এই পর্যন্ত বলে রায়হান একটু থামল। হোস্টেলের ছাদের হিমশীতল বাতাসেও আমি খেয়াল করলাম রায়হানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। সে তার সিগারেটের শেষ অংশটুকু পায়ের নিচে পিষে ফেলে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল।
আমি রীতিমতো কাঁপছিলাম। গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর? সুমাইয়া আপা কেমন আছেন এখন? ওনাদের বাচ্চার কী হলো?”
রায়হান ম্লান হেসে বলল, “তারপর কয়েক মাস পর আপা তাদের নিজেদের শহরেই একটা সুস্থ ফুটফুটে পুত্রসন্তানের জন্ম দেয়। আমরা সবাই ভেবেছিলাম, যাক, ওই অভিশপ্ত রাতের দুঃস্বপ্নগুলো হয়তো ওখানেই শেষ। নতুন শহরে, নতুন পরিবেশে আপা আর আরিফ ভাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিল। সবকিছু যেন আবার আগের মতো শান্ত, সুন্দর হয়ে গিয়েছিল।”
“তাহলে তো সব ঠিকই আছে,” আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললাম।
“না রে,” রায়হানের গলাটা হঠাৎ করে অস্বাভাবিক গম্ভীর হয়ে গেল। “গল্পের শেষটা এখানেই নয়।”
সে পকেট থেকে তার স্মার্টফোনটা বের করল। স্ক্রিন আনলক করে গ্যালারি থেকে একটা ছবি বের করে আমার চোখের সামনে ধরল।
“এটা আমার সেই ভাতিজার ছবি। গত মাসে ওর পাঁচ বছরের জন্মদিন ছিল। জন্মদিনের পার্টিতে আরিফ ভাই নিজের হাতে ছবিটা তুলেছিল।”
আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে ছবিটার দিকে তাকালাম। সুন্দর, গোলগাল একটা বাচ্চা ছেলে। মাথায় জন্মদিনের টুপি, মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে বেলুন আর সাজসজ্জা। দৃশ্যত খুব সাধারণ এবং আনন্দের একটা ছবি।
কিন্তু ছবিটার দিকে একটু গভীরভাবে তাকাতেই আমার বুকের রক্ত ছলাৎ করে উঠল। আমি অবাক এবং চরম আতঙ্ক নিয়ে একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম।
ছবিটায় ছেলেটা একা দাঁড়িয়ে নেই।
ছেলেটার ঠিক পেছনে, ড্রয়িংরুমের আধো-অন্ধকার একটা কোণায়, সোফার পেছনের ফাঁকা জায়গাটাতে ঝাপসাভাবে আরও তিনটা ছোট ছায়া দাঁড়িয়ে আছে।
ছায়াগুলা কোনো আসবাবপত্র বা মানুষের ছায়া নয়। সেগুলো স্পষ্টতই তিনটা ছোট বাচ্চার অবয়ব। কিন্তু তাদের কোনো মুখমণ্ডল নেই। তারা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার বন্ধুর ভাতিজার ঠিক পেছনে, যেন তারা ওই পরিবারেরই কোনো অংশ।
আমার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় রায়হানের দিকে তাকালাম। আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না।
রায়হান আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে স্ক্রিনটা অফ করে দিল। চারদিকের কুয়াশা যেন আরও ঘন হয়ে আসছে। হোস্টেলের পুরোনো ছাদটাকে আমার কাছে হঠাৎ একটা গোরস্তানের মতো মনে হতে লাগল।
রায়হান শূন্য দৃষ্টিতে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে ধীরে, ফিসফিস করে বলল—
“অদ্ভুত ব্যাপার জানিস?”
“কী?” আমি কোনোমতে উচ্চারণ করলাম।
“আমার ভাতিজা ইদানীং মাঝে মাঝেই একা একা কথা বলে। আপা জিজ্ঞেস করলে সে হাসতে হাসতে বলে—”
রায়হান একটু থামল। তারপর একটা অদ্ভুত, শীতল গলায় তার ভাতিজার কথাটা নকল করে বলল,
“আমার তিনটা বন্ধু আছে মা। ওরা সারা দিন ঘুমায়… আর শুধু রাতে আমার সাথে খেলতে আসে…”